নিজস্ব প্রতিনিধি: শহর কলকাতা(Kolkata) থেকে বেশি দূরে নয়। সড়ক পথে ৫০কিমি আর রেলপথে ৪৫কিমি। সেই শহর প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছেন বাংলার রূপকার বিধানচন্দ্র রায়। শহরের নাম তাঁরই প্রেমিকার নামে, কল্যাণী(Kalyani)। চিরকালীন নিরিবিলির শহর। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই শহরের ২-৩টি বিগ বাজেটের দুর্গাপুজোর(Durga Puja) হাত ধরে পুজোর দিনগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ হাজির হচ্ছেন সেখানকার পুজো দেখতে। আর এই লক্ষ লক্ষ মানুষের আগমনে শহরের মূল বাসিন্দাদের কার্যত নিজেদের বাড়িতে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। শুনলে অবাক হয়ে যাবেন, এবারের পুজোতে সব থেকে বেশি যে অভিযোগ কল্যাণীতে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে তা হল লোকের বাড়ির বাগানে, দরজার বাইরে, গেটে, পাঁচিলের ভিতরে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করে গিয়েছে হাজার হাজার দর্শনার্থী(Visitors)। আর সেই সব মলমূত্রের দুর্গন্ধে নিজেদের বাড়িতেই কার্যত দরজা জানলা বন্ধ করে বসে থাকতে হচ্ছে কল্যাণীর একটা বড় অংশের মানুষদের(Residents)।
আরও পড়ুন, কার্নিভাল শুরুর আগেই শহরে থমকালো মেট্রোর পরিষেবা, ভোগান্তি যাত্রীদের
গল্প এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ আছে আরও বিস্তর। সেই অভিযোগ চুরির। বাড়ির বাইরে রাখা অনেক সৌখিন আসবাব যেমন দোলনা, চেয়ার, ছোট টেবিল, ফুল গাছের টব হয় যথেচ্ছারে ভাঙা হয়েছে নয়তো তা গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়ির কাঁচে লোহার পেরেক জাতীয় কিছু দিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ লিখে দিয়ে যাওয়া থেকে অশ্লীল ছবি এঁকে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও গাড়ির চাকার হাওয়া খুলে দেওয়া হয়েছে। কোনও কোনও বাড়ির দেওয়ালে, দরজায় কিংবা জানলায় নর্দমার পাঁক থেকে নোংরা কাদা মায় মলমূত্র পর্যন্ত লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির কাচ ভাঙা হয়েছে ঢিল ছুড়ে, ফুলের গাছ নষ্ট করা হয়েছে। খাবারের প্যাকেট, জলের ফাঁকা বোতলের ছড়াছড়ি তো আছেই। উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলা হয়েছে যত্রতত্র। বাড়ির গেটের সামনে ফেলে রেখে গিয়েছে বাক্স সমেত আধখাওয়া বিরিয়ানি। সব মিলিয়ে সাজানো-গোছানো, নিরিবিলি শহর কল্যাণী এখন এক তাণ্ডবের ছবি ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
আরও পড়ুন, লক্ষ্মী পুজোর আগে বাজার দর আগুন, নাভিশ্বাস উঠছে বাঙালির
কিন্তু কেন এমন অবস্থা? এলাকাবাসীর দাবি, আগে কল্যাণীর পুজো দেখতে এত ভিড় হতো না। কিন্তু কোভিডের পর থেকে কল্যাণীর পুজো ভীষণ ভাবেই সোশ্যাল মিডিয়াতে হাইপ পাচ্ছে। ভাল নজরকাড়া প্যান্ডেলও হচ্ছে। কার্যত কলকাতার শ্রীভূমির ৪-৫গুণ বেশি ভিড় ধেয়ে আসছে কল্যাণীর এক একটি বিগ বাজেটের পুজো দেখতে। কিন্তু সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় সামাল দেওয়ার মতো কোনও পরিকাঠামোই নেই ওই শহরের। না আছে পুলিশ, না আছে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক, না আছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সুলভ শৌচালয় ও জঞ্জাল ফেলার জায়গা। সবটাই চলছে চূড়ান্ত অপরিকল্পিত ভাবে। পুজো কমিটিগুলি কোটি কোটি টাকা খরচ করে পুজো করছে ঠিকই, কিন্তু তাঁরা এই সব সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না। তাঁদের দাবি এগুলি পুলিশ আর প্রশাসনের দেখার কথা। আবার প্রশাসন ও পুলিশের দাবি এগুলি ক্লাব কর্তৃপক্ষের দেখার কথা। আরও ভয়াবহ কথা শুনিয়েছেন শহরবাসী। এবারে ভিড়ের চাপে বেশ কিছু মানুষের হাতে-পায়ে আঘাত লেগেছে বা ভেঙেছে। পদপিষ্ট হওয়ার মতোও পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বড় কিছু যে হয়নি সেটাই অনেক।
আরও পড়ুন, ‘দ্রোহের কার্নিভাল’ ঠেকাতে ১৬৩ ধারা শহরের বেশ কিছু অংশে
কল্যাণীর বাসিন্দাদের ক্ষোভ কিন্তু ভিড় হওয়া নিয়ে নয়। বরঞ্চ তাঁরা গর্বিত যে আশেপাশে জেলা থেকে মায় কলকাতা থেকেও হাজার হাজার মানুষ যাচ্ছেন তাঁদের শহরে পুজো দেখতে। কিন্তু এখন তাঁদের যে নোংরামি সহ্য করতে হচ্ছে তা একশ্রেনীর মানুষের নোংরা মানসিকতা। তাঁদের দাবি, ‘মানুষের ভিড় সহ্য করা যায়। কিন্তু এমন নোংরামো অসহ্য। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে তাঁদের যেতে হচ্ছে তার দাম কে দেবে? মলমূত্রের গন্ধ তো সহ্য করতেই হচ্ছে, সাজানো গোছানো বাড়ি-বাগান যেভাবে নোংরা করা হয়েছে, নষ্ট করা হয়েছে, ভাঙচুর করা হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? বাড়ির দেওয়াল থেকে গাড়ির কাঁচে যে সব নোংরামি করে যাওয়া হয়েছে সেগুলির আর্থিক ক্ষতিপূরণ কে দেবে? এই অবস্থার জন্য শহরের বাইরে থেকে আসা অসচেতন দর্শনার্থীদের আগামী দিনেও এমন কাজ করতে ঠেকাবে কে? কার্যত কল্যাণীর বাসিন্দারা এখন নিজেদের ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়াতে। যদিও ছবি যে আগামী দিনে আরও খারাপ হবে সেটাও তাঁরা বিলক্ষণ জানেন।