পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : হিন্দুধর্ম অনুসারে শ্রীবিষ্ণু হলেন এই সৃষ্টির পালনকর্তা। তিনি ব্রহ্মার সৃষ্টিকে রক্ষা করেন ও দেবাদিদেব মহেশ্বর ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নতুন সৃষ্টির পথ প্রস্তুত করেন। সৃষ্টির সময় থেকে যখনই পৃথিবী মহাসংকটে পড়েছে, ধর্ম ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে ও অধর্ম বেড়েছে —তখনই দুষ্কৃতীদের বিনাশ করতে বিষ্ণু আবির্ভূত হয়েছেন নানা অবতারে। জানা যায়, বিষ্ণুর দশ অবতারের মধ্যে দ্বিতীয় অবতার হলেন কূর্ম অবতার, অর্থাৎ কচ্ছপ রূপে আবির্ভাব। সেক্ষেত্রে আমাদের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, যে কূর্ম রূপে কী ভাবে তিনি সৃষ্টির রক্ষা করেছিলেন? চলুন জেনে নেওয়া যাক কূর্ম অবতারের অজানা কাহিনী।
দেবরাজ ইন্দ্রের অহংকার ও দুর্বাসার অভিশাপ
নরসিংহ পুরাণ অনুযায়ী, এক সময় দেবতাদের মধ্যে অহংকার চরমে পৌঁছায়। নিজেদের শক্তি ও প্রভাব নিয়ে তাঁরা এতই আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন যে অসুরদের বিরুদ্ধে সাধু ও সন্ন্যাসীদের রক্ষা করার দায়িত্ব ভুলে যান। এই অবস্থায় মহর্ষি দুর্বাসা একদিন স্বর্গে গিয়ে দেবরাজ ইন্দ্র-কে পারিজাত ফুলের মালা উপহার দেন। কিন্তু ইন্দ্র মালাটিকে যথাযথ সম্মান না দিয়ে, তা নিজের গলায় না পরে তাঁর বাহন ঐরাবতের মাথায় রেখে দেন। ঐরাবত সেই মালাকে পায়ের নিচে পিষে ফেলে। এই অবমাননায় ক্রুদ্ধ হয়ে দুর্বাসা মুনি দেবতাদের অভিশাপ দেন, যে তাঁরা তাঁদের সমস্ত দৈব শক্তি হারাবেন। এই অভিশাপের ফলে দেবতারা দুর্বল হয়ে পড়েন, আর তার সুযোগ নিয়ে অসুররা তাদের উপর চড়াও হয়।
বিষ্ণুর শরণাপন্ন দেবতারা
দেবতারা সকল শক্তি হারিয়ে অসহায় হয়ে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণু তাঁদের শোনান যে, দেবতা ও অসুররা একসঙ্গে সমুদ্র মন্থন করলে অমৃত উঠবে। সেই অমৃত পান করেই দেবতারা পুনরায় তাঁদের শক্তি ফিরে পেতে পারবেন। তবে এই সমুদ্র মন্থন এত সহজ নয়। এজন্য প্রয়োজন ছিল বিশাল পর্বত, শক্তিশালী দড়ি এবং এক বিশেষ সহায়তা—যা পরে বিষ্ণুর কূর্ম অবতারের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়।
অসুরদের সঙ্গে মিলিত উদ্যোগ
বিষ্ণুর পরামর্শ অনুযায়ী, দেবগুরু বৃহস্পতি অসুরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অসুরদের বলা হয়, অমৃত উত্তোলন করা হলে তারা এর অর্ধেক অংশ পাবে। এই শর্তে অসুররাও সমুদ্র মন্থনে অংশ নিতে রাজি হয়।
সমুদ্র মন্থনের আয়োজন
সমুদ্র মন্থনের জন্য মন্দার পর্বত-কে মন্থনের দণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং নাগরাজ বাসুকি-কে দড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মন্দার পর্বতের চারপাশে বাসুকিকে জড়িয়ে একদিকে দেবতা ও অন্যদিকে অসুরেরা মন্থন শুরু করেন। কিন্তু মন্দার পর্বতটি অতিরিক্ত ভারী হওয়ায় সমুদ্রের কোমল তলদেশে ধ্বসে পড়ে এবং সমুদ্র মন্থন অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
বিষ্ণুর কূর্ম অবতার: কচ্ছপ রূপে উদ্ধার
এই কঠিন পরিস্থিতিতে বিষ্ণু কচ্ছপের রূপ ধারণ করেন, যা কূর্ম অবতার নামে পরিচিত। তিনি একটি বিশালাকার কচ্ছপ হয়ে সমুদ্রের তলদেশে গিয়ে মন্দার পর্বতকে নিজের পিঠে ধারণ করেন। এর ফলে মন্থন সহজভাবে সম্পন্ন হয়। সমুদ্র থেকে একে একে নানা দান, রত্ন, ও শেষে অমৃতের কলস উঠে আসে। এই অমৃত পান করেই দেবতারা আবার তাঁদের শক্তি ফিরে পান। বিষ্ণুর কূর্ম অবতার ছাড়া এই সমুদ্র মন্থন কখনও সফল হতো না।
কূর্ম জয়ন্তী: অবতারের স্মরণ
প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, বৈশাখ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে প্রতি বছর পালিত হয় কূর্ম জয়ন্তী। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনেই বিষ্ণু কূর্ম অবতারে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ভক্তরা এই দিন বিষ্ণুর পূজা করে থাকেন এবং তাঁর কৃপা লাভের জন্য উপবাস পালন করেন।
কূর্ম অবতার: প্রতীকী ব্যাখ্যা
কূর্ম অবতার শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় কাহিনি নয়, এটি এক গভীর প্রতীকী বার্তা বহন করে। পৃথিবী যখন ভারাক্রান্ত হয়, ন্যায়-অন্যায়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, তখন একজন পালনকর্তা নীরবে সেই ভার বহন করে পৃথিবীকে সুস্থ রাখেন। কূর্ম রূপে বিষ্ণু সেই পালন ও সহনশীলতার প্রতীক। মৎস্য অবতারে যেমন বিষ্ণু মহাপ্লাবন থেকে বিশ্বকে বাঁচিয়েছিলেন , তেমনই কূর্ম অবতারে তিনি সমুদ্র মন্থনের মতো বৃহৎ কর্মের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। এটি আমাদের শেখায়—নীরবভাবে দায়িত্ব নেওয়া, অন্যকে সাহায্য করা এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য সহনশীলতা দেখানো—এই গুণগুলিই সত্যিকারের শক্তির পরিচায়ক।
নিঃসন্দেহে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, বিষ্ণুর কূর্ম অবতার শুধুমাত্র পুরাণের একটি অধ্যায় নয়, বরং এটি ধর্ম, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য শিক্ষা। আজকের সমাজেও যখন স্বার্থপরতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার দেখা যায়, তখন কূর্ম অবতার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সহানুভূতি, ধৈর্য ও প্রকৃত দায়িত্বই এক সমাজকে রক্ষা করতে পারে। তাই কূর্ম জয়ন্তী শুধু উৎসব নয়, এটি এক নৈতিক শিক্ষার স্মরণ—যেখানে ধর্ম প্রতিষ্ঠা হয় সহনশীলতা ও নীরব শক্তির মাধ্যমে।