পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : পৈতে বা যজ্ঞপবিত দেখলে যেমন ব্রাহ্মণদের সহজে চেনা যায়, তেমনই কোনও ব্রাহ্মণ ব্যক্তিকে চেনার আরেকটি অব্যর্থ উপায় হল তাঁর মাথায় টিকি বা শিখা বা চূড়ামণি’র উপস্থিতি। ব্রাহ্মণদের মাথার পিছনের দিকে শিখা রাখার নেপথ্যে ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। জানা যায়, প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে ব্রাহ্মণদের শিখাধারণ অব্যাহত রয়েছে। কথিত রয়েছে, সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বৈদিক সংস্কৃতির অন্তর্গত দশবিধ সংস্কারের অন্যতম হল চূড়াকরণ বা শিখাধারণ। বৈদিক সংস্কৃতি অনুসারে, চূড়াকরণ ও উপনয়ন তথা দীক্ষাকালে মাথা মুণ্ডন করার পরে মাথার পিছনের দিকে মধ্যভাগে একগুচ্ছ কেশ রাখতে হয়। এই কেশগুচ্ছকেই বলা হয় শিখা। আবার, এই শিখা ভগবৎ-চেতনা দান করে বলে একে আবার চৈতন্যও বলা হয়ে থাকে। বৈদিক সংস্কৃতির অঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও কলিযুগের প্রভাবে অপসংস্কৃতি চর্চায় উৎসুক মানুষেরা অজ্ঞতাবশত একে আবার অ্যান্টেনা বলে উপহাস করে থাকেন। কেউ কেউ আবার মনে করে থাকেন এটি অশাস্ত্রীয়।
হিন্দু সনাতন ধর্মীয় প্রাচীন গ্রন্থ স্কন্দপুরাণের বিষ্ণুখণ্ডে-মার্গশীর্ষমাসমমাহাত্মমে শিখা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,
ব্রাহ্মণৈশ্চ বিশেষেণ বৈষ্ণবৈশ্চ বিশেষতঃ।
উপবীতং শিখা যদ্বচ্চক্রং লাঞ্ছনসংযুতম্॥
অর্থাৎ বিশেষত ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণবগণের পক্ষে যেরূপ উপবীত ও শিখা নৃত্য ধারণীয়, তদ্রূপ নিত্য চক্রচিহ্ন যুক্ত হবেন।”
খ্যাতনামা শ্রীমদ্ভাগবত টীকাকার শ্রীধর স্বামীর ব্যাখ্যায়, শিখা হচ্ছে ‘মস্তক মধ্যস্থ কেশপাশ।’ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অনুসারে, কর্ম তিন প্রকার। যথা কর্ম, অকর্ম ও বিকর্ম। বেদ বিহিত জড় কামনা-বাসনাযুক্ত কর্মকে বলা হয় কর্ম, জড়কামনা শূন্য হয়ে ভগবানের সন্তুষ্টিবিধানার্থে যে কর্ম, তাকে কলা হয় অকর্ম এবং বেদবিরুদ্ধ বা নিষিদ্ধ কর্মকে বলা হয় বিকর্ম। যেহেতু শিখাধারণ না করা শাস্ত্র বিরুদ্ধ, তাই শিখাহীন ব্যক্তিকে শাস্ত্রে বিকর্মস্থ বলা হয়ে থাকে।
আবার পুরাণে বর্ণিত কাহিনী অনুসারে মহান ঋষি মার্কণ্ডেয়ের প্রশ্নের উত্তরে দেবীকবচ বর্ণনা প্রসঙ্গে ব্রহ্মা বলেছিলেন —
শিখাং ম দ্যোতিনী রক্ষেদুমা মুর্ধ্নি ব্যবস্থিতা।
মালাধারী ললাটে চ ভ্রুবৌ রক্ষেৎ যশস্বিনী॥
অর্থাৎ—”দ্যোতিনী, আমার শিখা রক্ষা করুন, উমা আমার মস্তকে অবস্থান করুন এবং মালাধারি ললাটে ও যশস্বিনী আমার ভ্রুদ্বয় রক্ষা করুন।”
শিখার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কারণ
- ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক
- শাস্ত্র অনুযায়ী, শিখা রাখা মানে ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ করা এবং নিজের অহংকে বিসর্জন দেওয়া।
- এটি ব্রাহ্মণদের ধার্মিক ও শাস্ত্রীয় জীবনধারার প্রতীক।
- বৈদিক সংস্কৃতির অনুসরণ
- হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, বিশেষত যজুর্বেদ ও ধর্মশাস্ত্র মতে, শিখা ব্রাহ্মণদের বৈদিক ঐতিহ্যের প্রতীক।
- যজ্ঞ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শিখা থাকা বাধ্যতামূলক বলে মনে করা হয়।
- মৃত্যুর পর আত্মার মুক্তির পথ
- বিশ্বাস করা হয়, মৃত্যুর পর আত্মা ব্রহ্মরন্ধ্র (মাথার উপরের বিশেষ স্থান) দিয়ে দেহত্যাগ করে।
- যাদের শিখা থাকে, তাদের ব্রহ্মরন্ধ্রের পথ খোলা থাকে বলে মনে করা হয়, যা আত্মার মুক্তিতে সহায়তা করে।
শিখার বৈজ্ঞানিক কারণ
- মস্তিষ্কের শক্তি সংরক্ষণ
- শিখা রাখা হয় মস্তিষ্কের পেছনের অংশে, যেখানে মস্তিষ্কের সেরিবেলাম ও মেডুলা অবলংগাটা অবস্থিত।
- এটি স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- গবেষণা ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির সহায়ক
- সংস্কৃত ও আয়ুর্বেদ মতে, শিখা মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
- এটি মস্তিষ্কের পাইনাল গ্রন্থি (Pineal Gland) সক্রিয় করে, যা একাগ্রতা ও আত্মচেতনা বাড়ায়।
- শরীরের শক্তি কেন্দ্র সংরক্ষণ
- যোগ ও তন্ত্রশাস্ত্রে বলা হয়, শিখা রাখা শরীরের প্রানশক্তি বা ‘প্রাণায়াম শক্তি’ সংরক্ষণে সহায়তা করে।
- এটি মস্তিষ্কের শীতলতা রক্ষা করে এবং মানসিক চাপ কমায়।