পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: বেদে বলা হয়েছে “অহম ব্রহ্মাস্মি” – অর্থাৎ, আমিই ব্রহ্ম। মহাবিশ্বের সকল জীবই ব্রহ্ম। এতে “আমি” ও “তুমি” বা “আমি” ও “সে” এর মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। বিভিন্ন বেদে, উপনিষদে মানুষের জীবনের প্রত্যেক পর্যায়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করা হয়েছে। সেই সব ক্ষেত্রে একটি প্রশ্নই বারংবার ঘুরে ফিরে এসেছে, “আমি কে?” এই আমি’র উত্তর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভাবে পর্যালোচনা করা হলেও মূল উত্তরটি সব ক্ষেত্রেই মিলে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে এই আমিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আত্মার কথা উঠেছে আবার আত্মাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ধরা দিয়েছে ব্রহ্ম।
প্রাণী দেহের মূল বস্তু “আত্মা”, যা ব্যতীত কোনও প্রাণীর বাঁচা সম্ভব নয়। এই আত্মা শব্দটি একটি সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ “সার অথবা শ্বাস”। ধর্মতত্ত্বে আত্মা একজন ব্যক্তির সেই অংশকে বোঝায় যা দেবত্বের সাথে সম্পর্কিত এবং দেহের মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে। ধর্ম এবং দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে, আত্মা একজন মানুষের অস্পষ্ট দিক যা তাকে ব্যক্তিত্ব এবং মানবতা প্রদান করে। ভারতীয় শাস্ত্রে “আত্মা” শব্দটির প্রথম ব্যবহার পাওয়া যায় ঋগ্বেদে। আবার উপনিষদে আত্মা হল কেন্দ্রীয় বিষয়। উপনিষদে বলা হয়েছে যে আত্মা “মহাবিশ্বের চূড়ান্ত সারমর্ম”। আত্ম, স্বতন্ত্র, স্ব অর্থাৎ জীবাত্মা, পরমাত্মা এবং পরম বাস্তবতা অর্থাৎ ব্রহ্ম এর মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, যা বলে যে, তারা হল সম্পূর্ণ অভিন্ন অর্থাৎ অদ্বৈত, সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থাৎ দ্বৈত। এই আত্মাই প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্ম। অদ্বৈত বেদান্তেও প্রতিটি জীবের মধ্যে আত্মাকে ব্রহ্মের সাথে সম্পূর্ণ অভিন্ন হিসাবে দেখা হয়েছে।
এই আত্মা বিষয়ে বলতে গিয়ে জগদ্গুরু সর্বজ্ঞানী শ্রীকৃষ্ণ একটি খুব সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। শ্রীমদ্ভগবদগীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের “সাংখ্যযোগে” তিনি সখা অর্জুনকে বলেছিলেন :
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্
নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥
অর্থাৎ, আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না৷ তিনি জন্মরহিত শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না।
গুণগতভাবে পরমাত্মা ও তাঁর পরমাণুসদৃশ অংশ জীবাত্মার মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। জড় দেহের যেমন পরিবর্তন হয়, আত্মার তেমন কোন পরিবর্তন হয় না। তাই আত্মাকে বলা হয় কূটস্থ, অর্থাৎ কোনও কালে, কোনও অবস্থাতেই তার কোনও পরিবর্তন হয় না।