পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : ওঁ করালবদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাম্।
কালিকাং দক্ষিণাং দিব্যাং মুণ্ডমালাবিভূষিতাম্ ৷৷
সদ্যশ্ছিন্নশিরঃ-খড়্গ-বামাধোর্দ্ধ্ব করাম্বুজাম্।
অভয়ং বরদঞ্চৈব দক্ষিণাধোর্দ্ধ্ব পাণিকাম্॥
মহামেঘপ্রভাং শ্যামাং তথা চৈব দিগম্বরীম্।
কণ্ঠাবসক্তমুণ্ডালী-গলদ্রুধির-চর্চ্চিতাম্॥
দেবাদিদেব মহাদেবের অর্ধাঙ্গিনী সতী। তিনিই একাধারে পার্বতী, দক্ষিণা কালীকা, তারা, দুর্গা, তিনিই আদ্যাশক্তি মহামায়া। তিনিই সকল শক্তির আধার। তিনিই মহেশ্বরের নিত্য ক্রীড়াসঙ্গিনী, আবার তিনিই মহাদেবকে “মাতৃরূপেণ সংস্থিতা” হয়ে পান করিয়েছিলেন স্তন দুগ্ধ।
সতীর ৫১ পীঠের মধ্যে বাংলার অন্যতম মহাপীঠস্থান তারাপীঠ। পুরাণে বর্ণিত কাহিনী অনুসারে, দক্ষযজ্ঞ চলাকালীন যখন সতী মহেশ্বরের অপমান সহ্য করতে না পেরে যজ্ঞাগ্নিতে আত্মবিসর্জন করেছিলেন , মহাদেব তখন সেই দেহ কাঁধে তুলে দিগ্বিদিগ জ্ঞানশূন্য হয়ে সমগ্র ত্রিভুবন ঘোরাকালীন শ্রী বিষ্ণু তাঁকে শান্ত করার জন্য সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ টুকরো টুকরো করে কেটেছিলেন। কথিত আছে, তখন সতীর ত্রিনয়ন বা নয়নতারা তারাপীঠ অঞ্চলে পড়ে এবং প্রস্তরীভূত হয়ে যায়। জনশ্রুতি আছে, মুনি বশিষ্ঠ প্রথম এটি লক্ষ্য করে দেবী সতীকে তারা রূপে পুজো করতে থাকেন।
পৌরাণিক কাহিনী থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, সমুদ্রমন্থন কালে সমুদ্র থেকে উত্থিত হলাহল বিষ মহাদেব পান করে গলায় বিষক্রিয়া হয়ে গেলে মাতা সতী তারা রূপে স্তন দুগ্ধ পান করিয়ে সেই ভয়ঙ্কর বিষক্রিয়া থেকে নীলকণ্ঠ শিবকে রক্ষা করেছিলেন। তারাপীঠ সিদ্ধক্ষেত্রে মহামুনি বশিষ্ঠ যখন সাধনা করছিলেন, তিনি প্রথমবার সাধনায় অসফল হলে তিব্বতে গিয়ে গৌতম বুদ্ধের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তারাপীঠে ফিরে বুদ্ধের আদেশে মুনি বশিষ্ঠ বামমার্গে মদ্যমাংসাদি পঞ্চমকারসহ তারাদেবীর সাধনা করলে তারাদেবী শিবকে স্তন্যদানকারী রূপে দর্শন দেন। জানা যায়, তারা মায়ের সেই অভূতপূর্ব স্তন্যদানকারিনী মূর্তি তৎক্ষণাৎ প্রস্তরীভূত হয়। তখন থেকেই তারাপীঠ মন্দিরে শিশু শিবকে স্তন্যপানরতা মূর্তিতে দেবী তারা পূজিতা হয়ে আসছেন।
জানা যায়, তারাপীঠের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ সাধক হলেন বামাচরণ চট্টোপাধ্যায় (১৮৪৩-১৯১১) , যিনি পরিচিত ছিলেন বামাক্ষ্যাপা নামে । মন্দিরের নিকটেই তাঁর আশ্রম ছিল। তিনি ছিলেন তারাদেবীর একনিষ্ঠ ভক্ত। বামাক্ষ্যাপা ছিলেন উনিশ শতকের প্রসিদ্ধ কালীভক্ত শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের সমসাময়িক। অল্পপবয়সেই বামাক্ষ্যাপা সমগ্র তারাপীঠের প্রধান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। ভক্তেরা তাঁর কাছে আশীর্বাদ বা আরোগ্য প্রার্থনা করতে আসত। কেউ কেউ আবার শুধুই তাঁকে দর্শন করতে আসত। জানা যায়, তিনি মন্দিরের নিয়ম মানতেন না। শোনা যায়, একবার তারাদেবী নাটোরের মহারানিকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে দেবীর পুত্র বামাক্ষ্যাপাকে প্রথমে ভোজন করাতে আদেশ দেন। এরপর থেকে মন্দিরে দেবীকে নৈবেদ্য নিবেদনের পূর্বে বামাক্ষ্যাপাকে ভোজন করানো হত এবং কেউ তাঁকে বাধা দিতেন না। জনশ্রুতি আছে, তারাদেবী শ্মশানক্ষেত্রে ভীষণা বেশে বামাক্ষ্যাপাকে দর্শন দিয়ে তাঁকে স্তন্যপান করিয়েছিলেন।
কৌশিকী অমাবস্যার রাতে তারা মা’য়ের নাম জপ করলে সেই ভক্তের ওপর মা খুব তুষ্ট হন। জানা যায়, এই তিথিতেই তারাপীঠের মহাশ্মশানের শ্বেতশিমূল গাছের তলায় পঞ্চমুন্ডি আসনে বসে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন সাধক বামাক্ষ্যাপা।
তারা মায়ের ধ্যান মন্ত্র :
ওঁ প্রত্যালীঢ়পদাং ঘোরাং মুণ্ডমালাবিভূষিতাম্। খৰ্ব্বাং লম্বোদরীং ভীমাং ব্যাঘ্রচর্ম্মাবৃতাং কটৌ ॥১ ॥
নবযৌবন সম্পন্নাং পঞ্চমুদ্রাবিভূষিতাম্। চতুর্ভুজাং লোলজিহ্বাং মহাভীমাং বরপ্রদাম্ ॥২॥
খড়গকর্তৃসমাযুক্তাং-সব্যেতর-ভুজদ্বয়াম্। কৃপাণোৎপলসংযুক্ত-সব্যপাণি-যুগান্বিতাম্ ॥৩॥
পিঙ্গোগ্রৈকজটাং ধ্যায়েন্মৌলা বক্ষোভ্যঞ্চভূষিতাম্। বালার্কমণ্ডলাকার -লোচনত্রয়-ভূষিতাম্ ॥৩
জ্বলচ্চিতামধ্যগতাং ঘোরদংষ্ট্রাং করালিনীম্। স্বাবেশস্মেরবদনাংস্ত্র্যলঙ্কারবিভূষিতাম্।
বিশ্বব্যাপক-তোয়ান্তঃ শ্বেতপদ্মোপরিস্থিতাম্।।৫।।
জয় মা তারা।।