পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : তিনি বলেছিলেন, পুরীতে গেলে সেখানেই নাকি তিনি মহাপ্রভুতে বিলীন হয়ে যাবেন। তাই তিনি যাননি লীলা পুরুষোত্তম শ্রী জগন্নাথকে দেখতে। তবে আঁচলের ঢেকে তাঁর ছবি নিয়ে জগজ্জননী মা সারদা গিয়েছিলেন নীলাচলে। কথায় বলে “ছায়া ও কায়া সমান” – যা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতেন শ্রীমা। তাই প্রথমে ঠাকুরের ছবিকে দর্শন করিয়েছিলেন তিনি। তারপর দর্শন করেছিলেন নিজে।
সময়টা ১৮৮৮ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। শ্রীমা সারদা মা নীলাচলে (পুরী) রওনা দিয়েছিলেন মহাপ্রভুকে দর্শনের উদ্দেশ্যে। সেই যাত্রাপথে তাঁর সঙ্গী ছিলেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ, যোগানন্দ, সারদানন্দ, যোগীন মা, গোলাপ মা, লক্ষ্মীদিদি প্রমুখ। তখনও রেল পরিষেবা সেইভাবে চালু হয়নি, তাই তাঁরা প্রথমে কলকাতা থেকে জাহাজে চাঁদবালি পৌঁছেছিলেন। সেখান থেকে ছোট লঞ্চে করে কটক এসে গোরুর গাড়ি করে পৌঁছেছিলেন জগন্নাথধামে। পুরীতে পৌঁছেই সেদিনই জগন্নাথদেবের দর্শন সেরে ফেলেছিলেন তাঁরা।
শোনা যায়, মন্দিরে প্রবেশ করার পর প্রথমেই চোখ বুজে ছিলেন শ্রীমা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শ্রীরামকৃষ্ণদেব জীবদ্দশায় জগন্নাথ দর্শন করতে পারেননি। তাই তিনি আগে আঁচলে রাখা ঠাকুরের ছবিকে জগন্নাথের সামনে ধরছিলেন, যেন ঠাকুর জগন্নাথদেবের দর্শন পান। পরে মা বলেছিলেন, “জগন্নাথকে দেখলাম যেন পুরুষ সিংহ, রত্নবেদিতে বসে আছেন, আর আমি দাসী হয়ে তাঁর সেবা করছি।” অপলক দৃষ্টিতে বিগ্রহের দিকে তাকিয়ে ছিলেন মা, এই দর্শনের অনুভূতিতে তিনি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন।
এখানেই থেমে থাকেনি মায়ের অভিজ্ঞতা। এই ভাবাবেগময় সময়ে মা পুরীতে দুই মাসেরও বেশি সময় কাটিয়েছিলেন। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ১২ জানুয়ারি ১৮৮৯ পর্যন্ত। পুরীতে থাকাকালীন একদিন স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন, অসংখ্য শালগ্রাম শিলার বেদী, তার ওপর জগন্নাথ শিবমূর্তি ও শিবলিঙ্গরূপে বিরাজমান। তখন মা বলেন, “এত লোক আসছে? একটা কিছু না থাকলে এতো লোক হয়? বিমলাদেবী আছেন। তাঁর পুজোয় বলি হয় মহাষ্টমীর রাতে। বিমলা দুর্গা তো? কাজেই শিব থাকবেন না?” এইভাবে মা উপলব্ধি করেছিলেন জগন্নাথধামের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য।
আরেকদিন জগন্নাথ মন্দিরের ভিতরে লক্ষ্মী মন্দিরে মা যোগীন মায়ের সঙ্গে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। হঠাৎ মায়ের মনে ভাব জাগে, “এত লোক জগন্নাথ দর্শন করছে, সবাই তো মুক্তি পাবে!” মায়ের চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ছে । তখনই শ্রীমা এবং যোগীন মা এক দেববাণী শোনেন — “যারা বাসনাশূন্য, তারাই মুক্ত হবে।” এ বাণী শোনার পর মায়ের মনে স্পষ্ট হয়েছিল, প্রকৃত মুক্তি পেতে হলে মানুষকে সকল বাসনা ত্যাগ করতে হবে। এ উপলব্ধি মায়ের অন্তরে গভীর সত্যের জন্ম দেয় যে, “এক-আধজন বাসনাহীন ব্যক্তি ছাড়া কেউ মুক্ত হবে না।”
পুরীর বিভিন্ন তীর্থ ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন, বিশেষত লক্ষ্মীর মন্দিরে বসে দীর্ঘক্ষণ ধ্যান করতেন। জগন্নাথদেবের এই তীর্থযাত্রা শ্রীমা সারদার জীবনে এক অনন্য আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা এবং চেতনার উন্মোচন ঘটিয়েছিল, যা পরে অসংখ্য ভক্তকেও প্রেরণা যুগিয়েছে। শ্রীমার এই অনুভব আমাদের শেখায় প্রকৃত মুক্তির জন্য নিঃস্বার্থ, নির্লোভ ও বাসনাহীন হওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
নীলাচল নিবাসায় নিত্যায় পরমাত্মনে
বলভদ্র সুভদ্রাভ্যাং জগন্নাথায় তে নমঃ