নিজস্ব প্রতিনিধি, কানপুর: একজন যুবক ১০ বছর ধরে পুলিশের পোশাক পরে প্রথমে কনস্টেবল এবং তারপর সাব-ইন্সপেক্টর হয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করল, পদের মিথ্যা দাবি নিয়ে বিয়ে করল, তার স্ত্রী থেকে শুরু করে শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেউই কিছু জানতে পারল না। শুনতে হয়তো সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো, কিন্তু এটা চরম বাস্তব। কৌশাম্বীর বাসিন্দা আজাদ সিং জাদৌন নামে এক যুবক দশ বছর ধরে এই নাটক চালিয়ে আসছিল। তার ভুয়ো পরিচয় প্রকাশ করতে পুলিশেরও লেগে গেল ১০ বছর। পুলিশের উর্দি জাল করে নকল পরিচয়ের খেলা এমনভাবে খেলেছিল সে যে শ্বশুরবাড়ির লোকজনও পাঁচ বছর ধরে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিল যে তাঁদের একমাত্র জামাই একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ পুলিশ ইন্সপেক্টর।
এই গল্পের সূচনা হয় ২০১৫ সালে। সেই সময় আজাদ নিজেকে কনস্টেবল হিসেবে ঘোষণা করেন। থানার কাছেই একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকত সে। প্রতিদিন ইউনিফর্ম পরে বাইরেও যেত। ফলে আশপাশের প্রতিবেশীরা তাকে পুলিশ ভাবতে শুরু করে। থানার এত কাছে থেকে আসল পুলিশের নিজর কীভাবে সে এড়িয়ে ছিল সেটাই ভাবার। শুধু তাই নয়, পুলিশ পরিচয় দিয়ে মানুষ জনকে টুকটাক ধমকও দিত সে। এইভাবে মানব মননে নিজের ভুয়ো পরিচয়কেই সত্যি বলে প্রতিষ্ঠা করেছিল সে।
পাঁচ বছর পর ২০২০ সালে আজাদ নিজেকে সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে ঘোষণা করে। সে নতুন ইউনিফর্ম তৈরি করে, ব্যাজ লাগায় এবং আশপাশে বলতে শুরু করে যে তার পদোন্নতি হয়েছে। এই পর্ব থেকে তার প্রতারণার পরিধিও বাড়তে থাকে। এবার আর শুধু মানুষকে ভয় দেখানো নয়, বরং গাড়ি ধরে টাকা আদায় করা, পুলিশে চাকরি করিয়ে দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকার প্রতারণা করা চলতে থাকে তার।
সাব-ইন্সপেক্টর হওয়ার ‘মিথ্যা বেশ’ এতটাই সত্যি ছিল যে সাজেথির আমোলি গ্রামের জয়বীর সিং ২০১৯ সালে তাঁর মেয়ে সুজাতার সঙ্গে আজাদ সিং জাদৌনের বিয়ে দেন। সুজাতার পরিবার ভেবেছিল তাঁদের মেয়ে একজন দায়িত্বশীল পুলিশ অফিসারের স্ত্রী হবেন। শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও কখনওই জামাইকে সন্দেহ করেননি। প্রতিবারই জামাই পুলিশের পোশাক পরে এসে বলত যে তাকে বিশেষ তদন্তের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে, তাই সে থানায় যায় না। এমনকি স্ত্রীরও ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছিল যে তার স্বামী একজন সাব-ইন্সপেক্টর। বিয়ের পর সুজাতা বছরের পর বছর ধরে এই মিথ্যাকেই সত্য বলে জেনে এসেছে।
আজাদ তার শ্যালক সৌরভ সিংকেও এই ভুয়ো খেলায় জড়িয়ে ফেলে। সৌরভকে নিজের অনুসারী বানিয়ে গাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে রাস্তায় গাড়ি ধরে টাকা আদায় শুরু করে আজাদ। সৌরভ ভগ্নিপতির মর্যাদায় এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে পাঁচ বছর ধরে কখনও কোনও প্রশ্ন করেননি। যেখানেই সৌরভ যেতেন সেখানেই আজাদকে দেখিয়ে তার পুলিশি পরিচয় দিতেন। এভাবেই আজাদের সাহস বাবড়তে থাকে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে চালান কাটতে শুরু করে। চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা আদায় করতে থাকে।
এই নাটক দশ বছর ধরে চলতে থাকে। কিন্তু ওই যে কথাই আছে ১০ দিন চোরের, ১ দিন গৃহস্থের। এক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল। সাজেথিতে একটি চুরির ঘটনা ঘটে। তদন্তের জন্য গ্রামে আসেন ইন্সপেক্টর অবধেশ সিং। তাঁকে গ্রামবাসীরা জানান গ্রামের জামাই আজাদ সিং জাদৌনের কথা। তারপরেই সামনেই আসে আসল সত্য। পুলিশ ইন্সপেক্টর অবধেশ সিং ইটাওয়া থেকে খবর নিয়ে জানতে পারেন এই নামের কোনও সাব-ইন্সপেক্টর সাজেথিতে কখনও আসেননি। ফলে গোটা বিষয় পুলিশের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।
এরপর আজাদকে থানায় ডাকা হয়। সে শ্যালক সৌরভকে নিয়ে থানায় আসে পুলিশের পোশাক পরে। এখানে এসেও নিজ অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নিজেকে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রমাণ করার চেষ্টা করে। কিন্তু পুলিশ অফিসার তার কথার অসংলগ্নতা বুঝতে পারেন। তড়িঘড়ি তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। তল্লাশিতে অনেক নকল পোশাক, বেল্ট এবং পুলিশ সম্পর্কিত জিনিসপত্র পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় সত্য কথা প্রকাশ করতে বাধ্য হয় আজাদ সিং জাদৌন।
পুলিশ ভুয়ো ইন্সপেক্টর আজাদ সিং এবং তার শ্যালক সৌরভকে গ্রেফতার করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে সে ২০১৫ সাল থেকে ভুয়ো কনস্টেবল এবং ২০২০ সাল থেকে ভুয়ো ইন্সপেক্টর হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে মানুষকে প্রতারণা করে আসছে। এই সত্য প্রকাশ পেতেই আজাদের শ্বশুরবাড়ি এবং গ্রামে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল। সুজাতার বাবা জয়বীর সিং বলেন, “আমরা গর্বিত ছিলাম যে আমাদের মেয়ের বিয়ে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টরের বাড়িতে হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে আমরাই সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হয়েছি। গ্রামের লোকেরা নিচু স্বরে এও বলছে যে ইউনিফর্ম দেখে আমরা অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কেউ কখনও কাগজপত্র বা পরিচয়পত্র চাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।”