পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: মহাপ্রভু জগন্নাথের লীলা অপরিসীম। তিনি লীলা পুরুষোত্তম। তিনি তাঁর ইচ্ছানুযায়ী মন্দিরের বিভিন্ন কাজ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভক্তপ্রাণ রাজাদের দিয়ে করিয়ে নিয়েছেন। বিশ্বকবিও বলেছিলেন – কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। হ্যাঁ, তাঁর ইচ্ছাই সব, মানুষ তো নিমিত্ত মাত্র।
পুরীর শ্রীমন্দিরের শিখরে যে চক্রটি দেখা যায়, সেটি হল নীলচক্র। বলা হয়ে থাকে সেই চক্রই হল মহাপ্রভু শ্রী জগন্নাথের চিহ্ন। সেই নীলচক্র জগৎপালক শ্রী বিষ্ণুর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র সুদর্শন চক্রের প্রতিরূপ। এমন কি মন্ত্রেও এই চক্রের উল্লেখ করে বলা হয়েছে “ওঁ শঙ্খ চক্র ধরং বিষ্ণু দ্বিভূজং পীত বাসসম্”। তবে জেনে রাখা প্রয়োজন, পুরীর জগন্নাথ মন্দির নির্মাণকালে মন্দিরের চূড়ায় কোনো চক্র ছিল না। তবে, কি ভাবে এলো সেই চক্র ? কার মাধ্যমেই বা এল ?
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যার সিংহাসনের দায়ভার গ্রহণ করেছিলেন দক্ষিণ ভারতের চালুক্য বংশীয় রাজা মুকুন্দদেব হরিচন্দন। তিনি মহাপ্রভু জগন্নাথের পরম ও একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তিনিই মন্দির শিখরে অষ্টধাতু নির্মিত এই সুবিশাল নীলচক্র স্থাপন করেন। এই নীলচক্রের উচ্চতা ১১ ফুট ৮ ইঞ্চি ও ব্যাস ৭ ফুট ৭ ইঞ্চি। এই নীলচক্রে মোট দুটো চাকা আছে। এই চক্রের ভেতর আছে মোট আটটি চক্রনাভি, যা বাইরের চাকা দুটিকে যুক্ত করেছে।
এই নীলচক্রেই বাঁধা হয় মহাপ্রভুর পবিত্র ধ্বজা, যার নাম “পতিতপাবন বানা”। প্রচলিত নিয়মানুসারে মন্দির শিখরে এই পবিত্র পতাকা না থাকলে মহাপ্রভুর ভোগ হয়না। তাই ঝড় জল উপেক্ষা করে একজন গরুড়সেবক মন্দিরের শিখরে উঠে পতাকা বাঁধেন আর, কোনও একদিন কোনও কারণে নীলচক্রে পতিতপাবন বানা বাঁধা না হলে মন্দির বন্ধ থাকবে টানা ১৮ বছর। জেনে রাখা ভালো, এই নীলচক্রকেও কখনও কখনও মহাপ্রভু জগন্নাথের শুকনো ভোগ অর্পণ করা হয়। তারপর তা মহাপ্রসাদে পরিণত হয়, যাকে বলা হয় চক্রমনোহি।