নিজস্ব প্রতিনিধি, বেঙ্গালুরু: রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিজয় সম্বর্ধনা উৎসব পরিণত হয়েছে মর্মান্তিক শোকে। বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের কাছে পদদলিত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ১১ জনের, আহত হয়েছে ৪৭ জন। আজ বৃহস্পতিবার কর্ণাটক হাইকোর্টে হবে এই মামলার শুনানি। এবার এই বিষয় নিয়েও চলছে রাজনীতি।
৩ জুন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু আইপিএলে জয় পাওয়ায় গোটা দেশে বয়ে গিয়েছিল উত্তেজনার ঢেউ। কিন্তু বেঙ্গালুরু যেন সব সীমা লঙ্ঘন করে গিয়েছিল। কর্নাটকের কংগ্রেস সরকার ভোটে জয়ের সঙ্গে আইপিএল জয়ের তুলনা করে। পঞ্জাব কিংসকে ৬ রানে হারিয়ে আরসিবি জয়ী হওয়ার পরেই কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী, উপ মুখ্যমন্ত্রী, কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র এবং অন্যান্য দলীয় নেতারা ধারাবাহিকভাবে আনন্দ উদযাপন করার পরিকল্পনা করে। সরকার বুঝতে পারেনি যে আরসিবির জয়কে সরকারিভাবে উদযাপিত করতে গেলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে ভিকট্রি প্যারেড এবং ফ্রি পাসের খবর ছড়াতেই চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের বাইরে কয়েক লক্ষ লোকের জমায়েত হয়। গেট খুলতেই ফ্রি পাস নেওয়ার জন্য শুরু হয় বিশৃঙ্খলা। তাতে পদদলিত হয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়, ৪৭ জন গুরুতর আহত হন। এই ঘটনার জন্য রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সকলেই দোষারোপ করছে কর্ণাটক সরকারকে। যতই তারা বলুক ভোটে জয় আর আইপিএলে জয় এক নয়, তারপরেও কিছু প্রশ্ন উঠছেই।
৩ জুন আরসিবি কাপ জেতার পর সারা রাত ধরে বেঙ্গালুরুতে উৎসব চলেছিল। রাস্তা, পাবে ঢল নেমেছিল ভক্তদের। তা সত্ত্বেও কর্ণাটক সরকার আরসিবি কর্তৃপক্ষ কেন আবার ৪ জুন সন্ধ্যায় চিন্নাস্বামীতে জয় উদযাপনের পরিকল্পনা করে, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। আসলে কর্ণাটক সরকার রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর এই জয়কে রাজনৈতিক সুযোগ হিসাবে নিতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল জনসাধারণের মধ্যে নিজেদের জনপপ্রিয়তা বৃদ্ধি করতে। কিছুদিন পর এই উৎসবের আয়োজন করলে হয়তো এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। সেক্ষেত্রে যথেষ্ট নিরাপত্তা, আরও বেশি সংখ্যক পুলিশ দেওয়া যেত, ফ্রি পাস সংক্রান্ত বিভ্রান্তি কম হত। সর্বোপরি জনসমাগম কম হত। ফলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা হয়তো আর ঘটত না।
কর্ণাটক সরকার কীভাবে আইপিএল জয়কে ভোটে জয়ের সঙ্গে তুলনা করল তা নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক। উপ-মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার নিজে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন, “আরসিবির জয় কর্ণাটকের চেতনার জয়। আমাদের সরকার এই আনন্দ প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবে।” সরকারের ভাবমূর্তিকে ইতিবাচক ও উৎসবমুখর দেখানোর জন্যই ছিল এই প্রচেষ্টা।
৩ জুন রাতে শহরে সারারাত ধরে চলা উৎসব পর্যবেক্ষনের জন্য মোতায়েন হওয়া পুলিশ কর্মী ও আধিকারিকরা (অন্তত ৫০০০ পুলিশকর্মী) ১২ ঘণ্টা ধরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরের দিন সন্ধ্যায় পুনরায় তাদের মোতায়েন করা হয়েছিল। পুলিশকর্মীরাও মানুষ, তাঁরাও ক্লান্ত হন। ফলে পুলিশের ক্লান্তি পরিস্থিতিকে খারাপ ত্থেকে আরও খারাপ করে তুলতে সাহায্য করেছিল। ২-৩ লক্ষ ভিড় সামলানোর জন্য সেই ৫০০০ পুলিশকেই ডাকা হয়েছিল। তারা জরুরি অবস্থায় মানুষকে সুস্থ করতে যা যা প্রয়োজন (যেমন সিপিআর প্রদান) সেই সব বিষয়ে অনভিজ্ঞ ছিলেন।
ভারত এর আগে ১৭টি আইপিএল জয় উদযাপন করেছে। কিন্তু ২০২৫ এর মরশুমে আরসিবির জয়ের পর কর্ণাটক সরকারের উদযাপন ও দৃষ্টিভঙ্গি অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অতিরিঞ্জত ছিল। এর উদযাপন বিধান সৌধের মতো একটি সরকারি স্থানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অথচ বিধান সৌধ খেলার কোনও বিষয়ের জন্যই কোনওদিন ব্যবহৃত হয়নি। চেন্নাই সিপার কিংস বা মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের জয়ের পর অন্যান্য রাজ্য সরকার এত বড় পরিসরে সরকারি সম্পদ ব্যবহার করেনি। ডি কে শিবকুমার বিমানবন্দরে খেলোয়ারদের ব্যক্তিগতভাবে স্বাগত জানান। বিধান সৌধে সংবর্ধনা দেন। এটি আসলেই ছিল রাজনৈতিক কৌশল। ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে আঞ্চলিক সমর্থনকে পুঁজি করা। ২০২৩ সালে চেন্নাই যখন আইপিএল জয়ী হয় তখন তামিলনাড়ু সরকার কোনও সরকারি অনুষ্ঠান করেনি। পরিবর্তে শুধু অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিল।