নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকা: কথায় বলে, ‘চায়না মালের কোনও গ্যারান্টি নেই।’ কিন্তু তা জেনেশুনেও খয়রাতি সাহায্যের আশায় চিন থেকে একের পর এক মান্ধাতা আমলের যুদ্ধবিমান কিনেই চলেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। আর তার খেসারতও দিতে হচ্ছে। গত ১৭ বছরে ভেঙে পড়েছে চিন থেকে কেনা চারটি এফ-৭ যুদ্ধবিমান। আর ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন চার পাইলট-সহ ২২ জন। সোমবার (২১ জুলাই) ঢাকার অদূরে উত্তরায় এফ-৭ ভেঙে পড়ার পরেই চিন থেকে সস্তায় সমরাস্ত্র কেনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। যদিও এ বিষয়ে বাংলাদেশ বায়ু সেনা কিংবা তদারকি সরকারের তরফে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।
বিমান সংক্রান্ত ওয়েবসাইট ‘এয়ারফোর্স টেকনোলজি ডটকম’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, অবিভক্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি এমআইজে-২১ যুদ্ধবিমান নকল করে ষাটের দশকে লাল ফৌজের জন্য তৈরি করা হয় জে-৭ নামে এক ইঞ্জিন বিশিষ্ট যুদ্ধবিমান। চিনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদক সংস্থা চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশন (সিএসি) এই যুদ্ধবিমানের নির্মাতা। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা লাল ফৌজের বহরে সবচেয়ে বেশি উচ্চতায় উড়তে সক্ষম ও দ্রুতগামী যুদ্ধবিমান ছিল জে-৭। চিনের লাল ফৌজের পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি শুরু হয় এই যুদ্ধবিমানের। তবে জে-৭ নামে নয়, এফ-৭ নাম দিয়ে রফতানি করা হয়। রফতানির ক্ষেত্রে আমদানিকারক দেশের চাহিদা মেনে খানিকটা পরিবর্তন ঘটানো হয় বিমানটিতে। নামের সঙ্গে কিছু সঙ্কেত ব্যবহার করা হয়। যেমন, বাংলাদেশ যদি এই সিরিজের যুদ্ধবিমান আমদানি করে তাহলে এফ-৭ এর পর ইংরেজি অক্ষর ‘বি’ যুক্ত হবে। আর গ্লাস ককপিটের নকশার ক্ষেত্রে ‘জি’ এবং উন্নত সংস্করণ বোঝাতে ইমপ্রুভড এর ‘আই’ যুক্ত হবে। এমন সংস্করণের যুদ্ধবিমানে থাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল গ্লাস ককপিট, উন্নত রাডার ব্যবস্থা ও অ্যাভিওনিক্স (ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা) প্রযুক্তি। মান্ধাতা আমলের প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়ায় নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের চেয়ে এফ-৭ এর দুর্ঘটনার হার বেশি। এর প্রধান কারণ, পুরোনো নকশার এয়ারফ্রেম, সীমিত নিরাপত্তা, আধুনিক ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব।
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীও চিন থেকে এফ-৭ যুদ্ধবিমান ক্রয় করেছে। গত ১৭ বছরে প্রশিক্ষণের সময়ে সেই বিমান ভেঙেও পড়েছে। প্রথম বিমান ভেঙে পড়ার ঘটনাটি ঘটে ২০০৮ সালের এপ্রিলে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের পাহাড়িপাড়া গ্রামে পাইলটসহ বিধ্বস্ত হয় একটি এফ-৭ প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান। নিহত হন বিমানের চালক তথা বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার মোর্শেদ হাসান। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে তখন সম্ভাব্য কারিগরি ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়। এর সাত বছর বাদে ২০১৫ সালের জুনে এফ-৭ এমবি ৪১৬ মডেলের একটি যুদ্ধবিমান জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে ওড়ার পরেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কয়েক মিনিট পর যুদ্ধবিমানটি পতেঙ্গা সৈকতের প্রায় ৬ নটিক্যাল মাইল দূরে বঙ্গোপসাগরে ভেঙে পড়ে। নিখোঁজ হন পাইলট তাহমিদ রুম্মান। ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রশিক্ষণের সময় টাঙ্গাইলের মধুপুরে বিধ্বস্ত হয় এফ-৭ বিজি। ঢাকা থেকে আকাশে ওড়ার ২৫ মিনিটি পর মধুপুরের রসুলপুর এলাকায় বিধ্বস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। এতে নিহত হন পাইলট আরিফ আহমেদ। আর সোমবার ঢাকা থেকে ওড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের একটি ভবনে ভেঙে পড়ে এফ-৭ বিজি মডেলের যুদ্ধবিমান। পাইলট তৌকির ইসলাম সাগরের পাশাপাশি প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১৮ জন।