নিজস্ব প্রতিনিধি: ভোট হয় ঠিকই, কিন্তু ভারতের মতো দেশে অধিকাংশ বড় রাজ্যেই শাসক দল কার্যত ভোটটা করিয়ে নেয় নিজেদের মতো করে। এ রাজ্যেও সেই বিশ্বাস আর বস্তু দুটোই কায়েম ছিল বাম জমানায়। সেই সূত্রেই বামেদের ভোট রণনীতির অন্যতম অঙ্গ ছিল, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো। মানে, গ্রামের ভোট দিয়েই জয়ের মুখে দেখে নাও। বাম জমানায় শহর এলাকার ভোট বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যেত বামেদের বিরুদ্ধে যেত। সেখানে ভেলকি দেখাতেন বিরোধীরা। কিন্তু গ্রাম থেকে বামেরা যে লিড পেতেন, তাতে শহরে পিছিয়ে পড়ার জায়গার শূন্যস্থান পূরণ হয়ে যেত। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে এ রাজ্যের ক্ষমতায় বামেদের টিকে থাকার মূলে ছিল সেই গ্রাম বাংলার মানুষের সমর্থন, যা ধাক্কা খায় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের(Singur Nandigram Movement) সময়ে। এবারে আর জি কর কাণ্ডেও(R G Kar Incident) বামেরা সেই গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার নীতি নিয়েছিল বটে। কিন্তু তা সফল হয়নি। We Want Justice-ই বলুন আর মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিই বলুন, তা সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে শহরের রাজপথেই। এটা বামেদের(CPIM) কাছে যতটা অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে, ঠিক ততটাই স্বস্তি তৃণমূলের(TMC)।
আরও পড়ুন, শুক্র রাতে দীর্ঘ বৈঠকে মমতা-অভিষেক, কৌতুহল তৃণমূলে
একটু চোখ মেলে চাইলেই হবে। আর জি কর কাণ্ডের প্রতিবাদ-আন্দোলনের ঢেউ চোখে পড়ছে শুধুমাত্র রাজ্যের বড় বড় শহরগুলিতে। জেলা সদর বা মহকুমা শহরগুলিতেও তা চোখে পড়ছে। তবে কলকাতার তুলনায় এই সব জায়গায় আন্দোলনের ধার খুবই কম। আর আন্দোলন চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু সেখানেও গ্রাম নেই। কেন আন্দোলন আটকে শুধুই নগরে, তা বামেদের কাছে ভাববার বিষয়। হাতে গোনা কিছু গ্রামে অবশ্য মিছিল হয়েছে কিন্তু সেটাও প্রতীকী মাত্র। কেন এই সীমাবদ্ধতা আর জি কর আন্দোলনের? সমাজতত্ত্ববিদদের দাবি, গ্রাম চিরকালই শহর থেকে দূরে থাকে। এটা একটা মানসিকতা। যে আন্দোলনের সূচনা হয় গ্রামে, তা খুব দ্রুত একের পর এক গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু যে আন্দোলনের সূচনা শহরে তা গ্রাম ছুঁতে পারে অনেক দেরীতে। শহরের মানুষের মানসিকতা আর গ্রামের মানুষের মানসিকতা সমান নয়। সেখানেই ফারাক গড়ে দেয়। তাই আর জি কর আন্দোলনের বড় ছায়া দেখা যাচ্ছে না গ্রাম বাংলার বুকে। যদিও শহর লাগোয়া গ্রামগুলিতে মিছিল হচ্ছে। তার কলেবরও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এই সুফল বামেরা ভোট বাক্সে পাবে কিনা তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ থাকছে।
আরও পড়ুন, রাজ্যের মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের ৩৭ হাজার শিক্ষক এলেন EPF’র আওতায়
অনেকে এবার এটাও বলছেন, আর জি কর আন্দোলন এখন অনেক বেশি হুজুগে আর গুজবে পরিণত হয়েছে। যা ছড়িয়ে পড়ছে, তার কোনটা ঠিক, আর কোনটা ভুল, তা ভাবাচ্ছে গ্রামের মানুষকে। তাই শহরের স্রোতে গা ভাসাতে চাইছেন না তাঁরা। আসলে গ্রাম সহ্য করতে জানে। যখন সহ্যের সীমা পার হয়ে যায়, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, গ্রাম তখন রুখে দাঁড়ায়, ঘুরে দাঁড়ায়। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম তার জ্বলন্ত প্রমাণ। কিন্তু আর জি কর নিতান্তই শহুরে আন্দোলন হয়েই থেকে গিয়েছে। তাকে না বামেরা না গেরুয়া, গ্রামে নিয়ে গিয়েছেন। গ্রামে গেরুয়ার যাও বা কিছু সংগঠন আছে, বামেদের সেটাও নেই। আর জি কর আন্দোলনের মুখ যারা তা৬রা তো সবাই শহুরে। তাঁরা তো কেউ গ্রামে গিয়ে আন্দোলন করছেন না। আন্দোলনকে গ্রামে টেনেও নিয়ে যাচ্ছেন না। তাঁরা তো সব শহরে হইচই জুড়ে মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ার দৃষ্টি কাড়তেই ব্যস্ত। আসলে শহরে মিডিয়ার ফুটেজ মেলে যত সহজে, এলিট মহলে গুরুত্ব মেলে যত সহজে, তা গ্রামের ক্ষেত্রে মেলে না। আর তাই আর জি কর কাণ্ডও স্থিমিত শুধুই শহরে, গ্রাম রয়েছে যোজন দূরে।