পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : গীতায় বলা হয়েছে – “ন কর্মণামনারম্ভান্ নৈষ্কর্ম্যং পুরুষোহশ্নুতে । ন চ সন্ন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি ।।“
অর্থাৎ, কেবল কর্মের অনুষ্ঠান না করার মাধ্যমে কর্মফল থেকে মুক্ত হওয়া যায় না, আবার কর্মত্যাগের মাধ্যমেও সিদ্ধি লাভ করা যায় না।
ধর্মমতে বিভিন্ন সময়ে কৃত কর্মের ফল বিভিন্ন হয়ে থাকে। ঠিক তেমনই কুকর্মের জন্য কুফল ও সুকর্মের জন্য সুফল প্রাপ্তি হয়। এমন ঘটনার থেকে নিস্তার পাননি মহামুনি কশ্যপের স্ত্রী দিতি’ও। কথিত আছে, প্রজাপতি ব্রহ্মার পৌত্র ও মারিচির পুত্র ছিলেন মহামুনি কশ্যপ। তাঁর দুই স্ত্রী দিতি ও অদিতি ছিলেন যথাক্রমে অসুরকূল ও দেবকূলের জননী। কথিত আছে, একবার দিতি তাঁর এক সখীর সন্তানকে দেখে সন্তান ধারণের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। তিনি কুটিরে এসে কশ্যপ মুনিকে সন্তান দেওয়ার জন্য অনুনয় বিনয় করলে সেই সন্ধ্যাকালেই রাজী হয়ে যান তিনি। মিলনের পর কশ্যপ মুনি দিতিকে বলেন, সান্ধ্যকালে মিলনের ফল দিতিকে ভোগ করতেই হবে । কারণ, ধর্ম মতে সূর্যাস্তের পর মিলনের ফলে কুসন্তানের জন্ম হয় ও এই কর্ম অধর্ম বলে গণ্য হয়।
পৌরাণিক কাহিনী থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে জানা যায়, কশ্যপের ঔরসে দিতির গর্ভে দুই অসুর সন্তানের জন্ম হয়েছিল। তারা ছিল হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু। হিরণ্যাক্ষ বিষ্ণুর বরাহ অবতারের হাতে নিহত হলে হিরণ্যকশিপু ক্রোধে ব্রহ্মার কঠোর তপস্যা শুরু করেছিলেন। না খেয়ে দেয়ে হিরণ্যকশিপু বহু বছর ধরে তপস্যা করায় ব্রহ্মা খুব খুশি হয়ে বর দান করেছিলেন। হিরণ্যকশিপু অমরত্বের বর চাইলে ব্রহ্মা তা দিতে অপারগ হন। তখন হিরণ্যকশিপু এমন বরের কথা বলেন, যাতে সে দিনে বা রাতে, কোনো মানুষ বা কোনো জন্তুর দ্বারা, কিংবা কোনো অস্ত্রে আর, ভূতলে, জলে বা শূন্যে মারা না যান। এদিকে হিরণ্যকশিপুর সন্তান প্রহ্লাদ ছিল পরম বিষ্ণু ভক্ত। ফলে নিজের সন্তানকে মারার সকল প্রকার চেষ্টা করলেও ভক্ত প্রহ্লাদকে বিষ্ণু সবসময় রক্ষা করতেন।
এতো প্রচেষ্ঠাতেও বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদের মৃত্যু হয়নি দেখে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে প্রহ্লাদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কি ভাবে সে রক্ষা পেয়েছে ? প্রহ্লাদ হিরণ্যকশিপুকে জানান, শ্রী বিষ্ণুই তাকে এ সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেছেন। এরপর হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদের কাছে হরির সর্বত্র উপস্থিতির কথা জেনে রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রাসাদের এক স্তম্ভে গদাঘাত করলেন। এমন সময় সেই স্তম্ভ থেকে ভয়ঙ্কর করালদংষ্ট্রা নৃসিংহ রূপের আবির্ভাব হয়ে হিরণ্যকশিপুকে দুই উরুর উপর রেখে দিন ও রাতের সন্ধিকালে তাঁর বড় নখ দিয়ে পেট চিড়ে হত্যা করেছিলেন।
অপর দিকে মহামুনি কশ্যপ ও তাঁর আরেক স্ত্রী অদিতির থেকে দ্বাদশ আদিত্যের জন্ম হয়েছিল, যাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইন্দ্র। এভাবে কশ্যপমুনির বংশের থেকে দেব, দৈত্য, মানুষ, সাপ, পাখি ইত্যাদির সৃষ্টি হয়েছিল । কথিত আছে, ভগবান বিষ্ণু কশ্যপ ও অদিতির পুত্র বামন অবতার রূপে আবির্ভুত হয়েছিলেন ও প্রহ্লাদের পৌত্র মহারাজ বলির দর্পচূর্ণ করেছিলেন।