নিজস্ব প্রতিনিধি : আজ হল পঞ্চমী। উমার আগমনে উৎসবে মেতেছে ভক্তরা। প্রত্যেক বছর কৈলাস থেকে ছেলেমেয়েদের নিয়ে মর্ত্যে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসেন দেবী দু্র্গা। সিংহের পিঠে চড়ে আসেন দেবী দুর্গা,সঙ্গে থাকে পদতলে আহত অসুর। জানেন কী সিংহ কেন দেবী দুর্গার বাহন ? কীভাবে দেবী হলেন সিংহবাহিনী? তাহলে একবার ডুব দিন পুরাণ ভান্ডারে।
ভারতের বিভিন্ন স্থানে যে সমস্ত প্রাচীন মূর্তি পাওয়া যায় তাঁদের বাহন হিসেবে বাঘের দেখা পাওয়া যায়। আবার কোথাও বা দেবী দুর্গা সিংহবাহিনী।বাহন হিসেবে সিংহকে দেখা যায়।অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে এত পশু থাকতে কেবল সিংহই কেন দুর্গার বাহন।তবে জেনে নিন এর পেছনে কোন রহস্য রয়েছে।
বলা হয়, সিংহ হল প্রচণ্ড শক্তি, প্রবল রাগ, আক্রমণাত্মক মনোভাব ও রাজকীয় আচরণের প্রতীক। মহিষাসুরকে বধ করতে দেবী চামুণ্ডার রূপ নিয়েছিলেন। এককথায় সিংহের শক্তি, রাগ ও আক্রমণের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল দেবীর রণহুংকার।
মনে করা হয়, সিংহ মানে হল মহাশক্তিধর,একইসঙ্গে সিংহ হল রজো গুণের অধিকারী।শক্তি ও উচ্ছাসের প্রতীক হল সিংহ। অন্যদিকে দেবী দুর্গা হল অত্যন্ত বলশালিনী ও শৈর্যবর্তী।তাই সিংহের মত প্রাণীকে বশে রাখতে পারেন। অর্থাৎ সিংহের মত পরাক্রমশালী প্রাণিকেও বশে রাখতে পারে দেবী দুর্গা।তাই বাহন হিসেবে দেবী দুর্গাকে সিংহ দেওয়া হয়েছিল।
পুরান ব্যাখা : সিংহের যেমন প্রচন্ড শক্তি রয়েছে, তেমনই সে সাহসী। শুধু তাই নয় নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি এই প্রাণীর মধ্যে। তেমনই দেবী ত্রিভূবনকে দেবীর রক্ষা করতে এগিয়ে আসার মধ্যে নেতৃত্ব লুকিয়ে ছিল। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে এত সহজে জয় পাননি দেবী। ১০ দিন ধরে যুদ্ধে তিনিও রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন। কিন্তু সে যুদ্ধে তিনি পিছু হটেন নি। সমগ্র বিশ্বকে রক্ষা করার ভার নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর শরীর রক্তে ভেসে গেলেও শেষ পর্যন্ত নিজের কাজ সম্পূর্ণ করেছিলেন তিনি। দেবীর এই সাহস, এই নেতৃত্বের শক্তির কারণে সিংহ ছাড়া আর কোনও প্রাণীকে দেবী দুর্গার বাহন হিসেবে মানায় না। তাই বাহন হিসেবে সিংহকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন : ‘বেড়ার উপর হাতের ছাপ’, লাল দুর্গা প্রসন্ন হয়ে বিরাজমান পাচঁগাঁও মণ্ডপে
শ্রীশ্রীচণ্ডীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী,দেবতাদের সম্মিলিত তেজঃপুঞ্জ থেকে দেবী দুর্গার সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর দেবকুল তাঁদের নিজ নিজ অস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে দেবীকে যুদ্ধ সাজে সজ্জিত করে তোলেন।তখন হিমালয় দুর্গাকে তাঁর বাহন সিংহ দান করেন। কেননা সিংহ ছিল অত্যন্ত বলশালী ও রজোগুণের অধিকারী। যেহেতু দেবী তেজ থেকে সৃষ্টি হয়েছে তাই দেবীর উপযুক্ত বাহন হল সিংহ।
কীভাবে দেবী সিংহবাহিনী হয়ে উঠলেন : বাংলায় যে সিংহ সহ মহিষাসুরমর্দিনী প্রতিমায় পুজো হয় সেখানে দুইরকমের মাথাওয়ালা সিংহ দেখা যায়। প্রাচীন প্রতিমায় দেখা যায় যে সিংহের মুখটা অনেক ঘোড়ার মত। তাই এগুলোকে ‘ঘোড়াদাবা’ সিংহ বলা হয়।অর্থাৎ দাবা খেলার ঘোড়ার ঘুঁটির মতো মুখ। এর কারণ হল, প্রাচীন কালে বাংলায় যেহেতু সিংহ দেখা যেত না তাই শিল্পীরা এখানকার ঘোড়াকেই কেশর লাগিয়ে সিংহের রূপ দেয়। এরপর শিল্পীরা প্রতিমা তৈরির সময় সিংহের আসল চেহারা দেখে তাঁরা দেবীর বাহন হিসেবে সিংহ তৈরি করে। সেই থেকে দেবীর বাহন হয় সিংহ।
আরও পড়ুন : পুজোর আগেই জেনে নিন নিষিদ্ধপল্লীর মাটি ছাড়া কেন সম্ভব হয় না দেবীর মূর্তি গড়ার কাজ ?
অন্যদিকে বলা হয় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানের মাটির তলা থেকে যে সব দেবীমূর্তি পাওয়া গেছে তার মধ্যে খ্রিস্টের জন্মের আগের সময়ের মূর্তিতেও দেবীর বাহন হিসেবে সিংহের উপস্থিতি রয়েছে। প্রাপ্ত দুর্গার মূর্তিগুলির দু’টি রূপ পাওয়া যায়— মহিষমর্দিনী এবং সিংহবাহিনী।এর মধ্যে সম্ভবত মহিষমর্দিনী রূপটিই প্রাচীন। অনুমান করা হয়, সিংহ-সহ মহিষমর্দিনী মূর্তি এসেছে সপ্তম শতাব্দী থেকে। অর্থাৎ, বুদ্ধযুগ থেকে হিন্দুযুগে প্রত্যাবর্তনের একদম শুরুর দিকে মহিষমর্দিনী মূর্তি আস্তে আস্তে সিংহবাহিনী হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন : শত্রু থেকে ভক্ত! জেনে নিন ত্রিভুবন কাঁপানো মহিষাসুরের জন্ম রহস্য