পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : গণেশপুজো সম্প্রতি সারা ভারত জুড়েই বহুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে । আসলে এতো আর যে কে সেই পুজো নয়, এ হল বিঘ্ননাশক গণপতির পুজো। যাঁকে মহাদেবের আদেশানুসারে সকল দেবদেবীর আগে পুজো করা হয়। আর, গণেশ পুজো বলতেই সর্বপ্রথম যে রাজ্যের কথা মাথায় আসে, তা হল মহারাষ্ট্র। জানা যায়, সারা দেশের মধ্যে মহারাষ্ট্রে এই গণেশ উৎসবের উদযাপন অনেকটা অন্য রকমের। সেখানে সর্বাপেক্ষা ধুমধাম করে পুজো হয় গণপতি বাপ্পার । মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বই গণেশপুজোর প্রধান স্থান, যেখানে প্রতিবছর বড় বড় প্যান্ডেল নির্মান করে বিরাট বিরাট গণেশ মূর্তি এনে পুজো করা হয়।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী গণেশ পুজো প্রতি বছর ১০ দিন ধরে উদযাপিত হয়। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে শুরু হয় এবং চতুর্দশী তিথিতে শেষ হয় এই গণেশ পুজো। মুম্বাইতে এই সমস্ত সর্বজনীন পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম হল লালবাগের গণেশ পুজো। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয়ে থাকে “লালবাগচা রাজা” অর্থাৎ, এই লালবাগ অঞ্চলের রাজা হলেন স্বয়ং গণপতি। স্থানীয়দের থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে জানা যায়, গিরগাঁও চৌপাট্টিতে এই গণেশ মূর্তিটি পুজোর দ্বিতীয় দিন থেকে অনন্ত চতুর্দশী অর্থাৎ গণপতি বিসর্জন পর্যন্ত দর্শন করতে দেওয়া হয়।
“সুখকর্তা দুখহর্তা ভার্তা ভিঘ্নাচি
নুর্ভি-পুর্ভি প্রেম কৃপা জায়াচি।“
লালবাগচা রাজাকে স্থানীয়রা ইচ্ছাপূরণ গণেশ বলে মনে করে থাকেন। ১৯৩৪ সালে মুম্বাইয়ের লালবাগ অঞ্চলের বাজার এলাকায় স্থানীয় জেলেরা ও ব্যবসায়ীরা এই পুজো শুরু করেছিলেন।
এই পুজোর ইতিহাস নিয়ে জানতে গেলে ফিরে যেতে হবে ১৯০০ সালে। সে সময় মুম্বাই-পারেলের লালবাগ এলাকায় ১০০ টিরও বেশি টেক্সটাইল মিল ছিল। এই মিলগুলির কারণেই এই এলাকাটি স্থানীয়ভাবে গিরানগাঁও বা ‘কলের গ্রাম’ নামে পরিচিত ছিল। লোকমুখে শোনা যায়, ১৯৩০ সাল নাগাদ টেক্সটাইল মিলগুলিকে খুব বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল, যা সেই এলাকায় বসবাসকারী লোকেদের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে।
সে সময় স্থানীয় ব্যবসায়িক সম্প্রদায়টি বহু কষ্টে একটি জমি মঞ্জুর করে ও তারপর তারা সেই জমিতেই তাঁদের অধিষ্ট দেবতা গনেশের পুজো করা সিদ্ধান্ত নেয়। তখন থেকেই যত বছর গেছে, গণপতি বাপ্পা তাদের মনস্কামনা পূরণ করায় তাদের ব্যবসা বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে , ফলে পুজো ক্রমশ আরও বড় হয়েছে। স্থানীয়রা প্রতি বছর তাদের প্রিয় দেবতাকে বিভিন্ন পোশাক পরিয়ে তাঁকে “লালবাগের রাজা” বলে ডাকে। জানা যায়, সেই জমিটি ভগবান গণেশের নাম উৎসর্গীকৃত।
এই লালবাগচা রাজার উচ্চতা প্রায় ১৮-২০ ফুট। প্রতি বছর গণেশ চতুর্থীর আগেই প্রতিমা উন্মোচন অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে খুব ধুমধাম করে পুজো শুরু করা হয়। এখানকার বিশেষ আকর্ষণ হল গণপতি বিসর্জন অনুষ্ঠান। সমগ্র মুম্বাই শহর জুড়ে গণপতি বিসর্জনে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় এই পুজোতেই। লালবাগচা রাজা বিসর্জন প্রক্রিয়া শুরু হয় সকাল ১০ টা থেকে, আর চলে পরের দিন ভোর পর্যন্ত। প্রতি বছর গণেশ পুজোয় লালবাগচা রাজার কাছে লক্ষাধিক মানুষের ভিড় হয়। মুম্বাইয়ের নামি তারকারাও দূর দূরান্ত থেকে মানত করতে ও মনস্কামনা জানাতে আসেন এই গণপতির কাছে।