নিজস্ব প্রতিনিধি: বাংলার মাটিতে পদ্মশিবিরের বিকাশের পিছনে মতুয়াদের যে কাজে লাগানো যেতে পারে সেটা অমিত শাহের আবিষ্কার ছিল। সেই মতুয়াদের ওপর ভর দিয়ে বিজেপি যে শুধু ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বনগাঁ, রানাঘাট, মালদা উত্তর, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি কেন্দ্রগুলিতে সাফল্যের মুখ দেখেছিল তাই নয় একুশের বিধানসভা নির্বাচনেও তাঁরা নদিয়া জেলার রানাঘাট মহকুমা, উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমা এবং কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলায় বেশ কিছু আসনে জয়ের মুখ দেখেছে। কিন্তু এখন সেই মতুয়া ভোটই গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে বঙ্গ বিজেপির কাছে। শুধু যে বঙ্গ বিজেপির গলায় তা খচখচ করছে তা নয়, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেও বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। কেননা মতুয়াদের দাবি এখন আর শুধু নাগরিকত্ব আইনেই আটকে নেই, কার্যত তাঁরাই এখন বঙ্গ বিজেপির চালিকা শক্তি হয়ে উঠতে চাইছে। আর সেই উচ্চাশাই এখন বঙ্গ বিজেপিকে চূড়ান্ত বিভাজনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

দেশে নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে রাজনীতি করা নতুন কোনও ঘটনা নয়। তবে মতুয়াদের নিয়ে তৃণমূল ভিন্ন আর কাউকেই সেভাবে আগ্রহী হতে দেখা যায়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই মতুয়া ভোটব্যাঙ্ককে দেশের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তিনিই কেন্দ্রের মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে ও পরবর্তীকালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মতুয়াদের উন্নয়নের জন্য একাধিক পদক্ষেপ নেন। তারপরেও শুধুমাত্র নাগরিকত্বের দাবিতে মতুয়ারা বিজেপিমুখী হয়েছিলেন। বাংলা থেকে তৃণমূলকে উৎখাত করতে অমিত শাহ যেমন জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের কাছে টানতে চেয়েছিলেন তেমনি মতুয়াদেরও নাগরিকত্ব প্রদানের লোভ দেখিয়ে তাঁদের দলে টেনেছিলেন। কিন্তু উনিশের ভোটের পরে জল যত গড়িয়েছে ততই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে মতুয়াদের নাগরিকত্ব প্রদানের সেই শাহী আশ্বাস কার্যত ভুয়ো প্রতিশ্রুতি ভিন্ন আর কিছুই নয়। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ও ভোট প্রাপ্তির হিসাবই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মতুয়াদের ভোট আবারও তৃণমূলমুখী হতে শুরু করে দিয়েছে।

ঠিক এই রকম অবস্থায় মতুয়াদের মাথা তথা কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরকে বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব আর গুরুত্ব দিচ্ছে না। বরঞ্চ শান্তনু তৃণমূলে চলে যেতে পারেন এমনই একটা সম্ভাবনা ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাজুড়ে। এই অবস্থায় শান্তনুকেও দলের রাজ্য কমিটিতে যেমন ঠাঁই দেওয়া হয়নি তেমনি মতুয়া বিধায়ক থেকে নেতা কাউকেই সেভাবে আর কোনও পদ দেওয়া হয়নি। তার জেরেই ক্ষোভ ছড়িয়েছে মতুয়াদের মধ্যে। বঙ্গ বিজেপির ক্ষমতাসীন শিবির এখন প্রকাশ্যেই দাবি করছে, শান্তনু কার্যত ব্ল্যাকমেল করা শুরু করে দিয়েছেন। তিনি বঙ্গ বিজেপির সভাপতি হয়ে দলের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিতে চাইছেন। তাঁর সেই পরিকল্পনায় সায় নেই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। এমনকি সায় নেই সঙ্ঘেরও। এই অবস্থায় শান্তনুর নেতৃত্বেই বঙ্গ বিজেপির বিক্ষুব্ধরা জোট বেঁধে দলকেই পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। বঙ্গ বিজেপি কার্যত আড়াআড়ি ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও শান্তনুর বিরুদ্ধে চট করে কোনও পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। কেননা তাঁদের পা আটকে গিয়েছে মতুয়া ভোটের টানে। এখন তাঁদের অবস্থা কার্যত শাঁখের দশার মতো। শান্তনুর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নিলে মতুয়া ভোট ব্যাঙ্ক হারাতে হবে আর তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নিলে বাংলায় বিজেপি সাইনবোর্ড সর্বস্ব দলে পরিণত হবে। এগোলেও বিপদ, পিছোলেও বিপদ।